তরমুজের চাষ পদ্ধতি। তরমুজের বিভিন্ন জাতসমূহ এবং রোগবালাই দমন
তরমুজ একটি সুস্বাদু এবং গরমের সময় অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক ও তৃষ্ণা নিবারক একটি ফল। আমাদের দেশে যেসব উন্নতমানের তরমুজ পাওয়া যায় তা দেশের বাইরে থেকে আমদানিকৃত সংকর জাতের বীজ থেকে চাষ করা হয়ে থাকে।
জলবাযু ও মাটিঃ শুষ্ক,উষ্ণ ও প্রচুর সুয্যের আলো পায় এমন স্থানে তরমুজ ভালো হয়ে থাকে। তবে অধিক আর্দ্রতা তরমুজ চাষের জন্য ক্ষতিকর। খরা ও উষ্ণ তাপমাত্রা সহনশীলতা তরমুজের অনেক বেশি। উর্বর দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের জন্য উত্তম।
জমি তৈরিঃ প্রয়োজন অনুযায়ী চাষ ও মই দিয়ে তরমুজ চাষের জমি তৈরি করতে হবে। জমি তৈরির পর মাদা তৈরি করে নিতে হবে। মাদাতে সার প্রয়োগের পরে চারা লাগাতে হবে।
তরমুজের জাতঃ তরমুজের আধুনিক জাতসমূহের মধ্যে টপইল্ড, গ্লোরী, সুগার বেবি, বেবি তরমুজ (বারোমাসি ), ( ভিক্টর সুপার F1, ওসেন সুগার F1, ব্লাক জায়ান্ট F1,বঙ্গ লিংক F1,গ্রীন ড্রাগন ইত্যাদি) জাতগুলো নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত বপন করা যাবে। এছাড়াও ( সুপার এম্পেরর, ট্রপিক্যাল ড্রাগন,আনারকলি, চ্যাম্পিয়ন, ব্ল্যাক ডায়মণ্ড, ব্যাক সান) এগুলো ভাদ্র থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত চাষ করা যায়।
বংশ বিস্তারঃ বীজ দ্বারা সাধারণত তরমুজের বংশবিস্তার করা হয়ে থাকে।
বীজ বপন সময়/রোপণের সময়ঃ বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুযায়ী সাধারণত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময় তরমুজ চাষের উপযোগী। এছাড়াও আগাম কিছু জাত আছে যেগুলো নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত বপন করা যাবে। তবে বীজ বোনার জন্য জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম পক্ষ সর্বোত্তম। আগাম ফসল পাওয়ার ক্ষেত্রে জানুয়ারির শুরুতে বীজ বুনলে শীতের হাত থেকে কচি চারা রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
বপন/রোপণ পদ্ধতিঃ সাধারণত মাদায় সরাসরি বীজ বপন পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও চারা তৈরি করে মাদাতে চারা রোপণ করাই উত্তম।
বীজ বপনঃ প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বপন করা যাবে। তবে বীজ বপনের ৮-১০ দিন আগে মাদা তৈরি করে মাটিতে সার মিশাতে হয়। ২ মিটার দূরে দূরে সারি করে প্রতি সারিতে ২ মিটার অন্তর মাদা করতে হবে। প্রতিটি মাদা সাধারণত ৫০ সেমি. প্রশস্ত ও ৩০ সেমি.গভীর হতে হবে। চারা গজানোর পর প্রতি মাদায় দুটি করে চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলাই উত্তম।
চারা রোপণঃ বীজ বপণের চেয়ে তরমুজ চাষের ক্ষেত্রে চারা রোপণ করাই উত্তম। এতে বীজের অপচয় কম হবে। চারা তৈরির ক্ষত্রে ছোট ছোট পলিথিনের ব্যাগে বালি ও পচা গোবর সার ভর্তি করে প্রতিটি পলিব্যাগে ১ টি করে বীজ বপন করতে হবে। পরবর্তীতে ৩০-৩৫ দিন বয়সের ৫-৬ পাতাবিশিষ্ট ১ টি চারা মাদায় রোপণ করতে হবে।
বীজের পরিমাণঃ জাতভেদে প্রতি শতকে ১.৫-২ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
সার ব্যবস্থাপনাঃ তরমুজের জমিতে নিম্নে উল্লিখিত হারে সার প্রয়োগ করা যেতে পারে-
সার | মোট পরিমাণ
(হেক্টর প্রতি) |
মাদা তৈরির সময় সার | পরবর্তী পরিচর্যা অনুযায়ী মাদায় সারের পরিমাণ | |||
১ম কিস্তি( চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর) | ২য় কিস্তি(প্রথম ফুল ফোটার সময়) | ৩য় কিস্তি( ফল ধরার সময়) | ৪র্থ কিস্তি( ফল ধরার ১৫-২০ দিন পর) | |||
গোবর/কম্পোস্ট | ২০ টন | সব | – | – | – | – |
ইউরিয়া | ২৮০ কেজি | – | ১০০ কেজি | ৬০ কেজি | ৬০ কেজি | ৬০ কেজি |
টিএসপি | ১০০ কেজি | সব | – | – | – | – |
এমপি | ৩২০ কেজি | – | ৮০ কেজি | ৮০ কেজি | ৮০ কেজি | ৮০ কেজি |
বীজের অঙ্কুরোদগমঃ শীতকালে খুব ঠাণ্ডা থাকে বিধায় বীজ ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে গোবরের মাদার ভেতরে অথবা মাটির পাত্রে রাখা বালির ভেতরে বীজ রেখে দিলে ২-৩ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়। কেবল মাত্র বীজের অঙ্কুর দেখা দিলে তা বীজ তলায় বা মাদায় স্থানান্তর করা উত্তম।
তরমুজের অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যাঃ শুকনো মৌসুমে তরমুজে সেচ দিতে হবে। তবে গাছের গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিটি গাছে ৩-৪ টির বেশি ফল না রাখায় ভালো। গাছের শাখার মাঝামাঝি গিটে যে ফল হবে সেটি রাখতে হবে। সাধারণত ৪ টি শাখায় ৪ টি ফল রাখলেই যথেষ্ট। মূলত ৩০টি পাতার জন্য একটি মাত্র ফল রাখা উত্তম।
পরাগায়নঃ সাধারণত সকালে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল ফোটার সাথে সাথে স্ত্রী ফুলকে পুরুষ ফুল দিয়ে পরাগায়িত করে দিলে ফলন ভালো পাওয়া যায়।
পোকামাকড় ও রোগবালাইঃ
পাতার বিটল পোকাঃ শুরুতে পোকাগুলোর সংখ্যা যখন কম থাকে তখন পোকার ডিম ও বাচ্চা ধরে নষ্ট করে ফেলতে হবে। পোকার আক্রমণ বেশি দেখা গেলে রিপকর্ড ১০ইসি/ রিজেন্ট ৫০ এসসি ০১ মিলি/লিটার অথবা মিপসিন/সপসিন ৭৫ ডব্লিউপি ২.৫গ্রাম/লিটার বা প্রোক্লেম ১ গ্রাম/১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে।
জাব পোকাঃ এ পোকা গাছের কচি কাণ্ড, ডগা ও পাতার রস শুষে খেয়ে ক্ষতি করে। এ পোকা দমনের জন্য হেমিডর/প্রিমিডর (ইমিডাক্লোপ্রিড) ৭০ ডব্লিউজি ০২গ্রাম/১০লিটার পানিতে অথবা ইমিডাক্লোপ্রিড জাতীয় টিডো(০.৫মিলি/লিটার) / ইমিটাফ(১ মিলি/লিটার) / এডমায়ার (০.২৫ মিলি/লিটার) পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
ফল ছিদ্রকারী পোকাঃ স্ত্রী পোকা সাধারণত ফলের খোসার নিচে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কীড়াগুলো বের হয়ে ফল খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। পরবর্তীতে আক্রান্ত ফলগুলো পচে যায়। এই পোকা দমনের জন্য রিপকর্ড/রিজেন্ট/প্রোক্লেম অনুমোদিত মাত্রা অনুযায়ী স্প্রে করতে হবে। এছাড়াও এই পোকা দমনের জন্য ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে।
কাণ্ড পচা রোগঃ এই রোগের আক্রমণের ফলে তরমুজ গাছের গোড়ার কাছের কাণ্ড পচে গাছ মরে যায়। এই রোগ দমনের জন্য মেনকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন- ডাইথেন/ইণ্ডোফিল এম-৪৫ ২ গ্রাম/লিটার অথবা মেনকোজেব + কার্বেন্ডাজিম ( কম্প্যানিয়ন/ কেমামিস্ক/ক্লাস্টার) ২ গ্রাম/লিটার বা কপার অক্সিক্লোরাইড ( সানভিট/ডিলাইট) অনুমোদিত মাত্রায় ১০-১২ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।
ফিউজেরিয়াম উইল্ট রোগঃ এই রোগের আক্রমণের ফলে গাছ ঢলে পড়ে মারা যায়। তবে নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা হলে এ রোগের আক্রমণ কম দেখা যায়। মূলত রোগাক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
ফসল সংগ্রহঃ তরমুজ সাধারণত জাত ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পাকে। জাতভেদে বীজ বোপনের পর থেকে ৮০-১০০ দিন সময় লাগে। তরমুজের ফল পাকার সঠিক সময় নির্ণয় করাটা একটু কঠিন। কেননা বেশিরভাগ তরমুজে পাকার সময় তেমন কোনো বাহ্যিক লক্ষণ দেখা যায় না। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখলে তরমুজ পাকা কি না তা কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে।
- ফলের বোঁটার সাথে যে আকর্শি থাকে তা শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করে।
- তরমুজের খোসার উপরের সূক্ষ লোমগুলো মরে পড়ে গিয়ে খোসা চকচকে হয়ে যায়।
- তরমুজের যে অংশটি মাটির ওপর লেগে থাকে তা সবুজ থেকে উজ্জল হলুদ রং বর্ণে পরিণত হয়ে থাকে।
- তরমুজের শাঁস মূলত লাল টকটকে হয়ে যায়।
- আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিলে ড্যাব ড্যাব শব্দ করলে বুঝতে হবে যে, ফল পরিপক্ব হয়েছে। অপরিপক্ব ফলের বেলায় শব্দ অনেকটা ধাতবীয় হবে।
ফলনঃ সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে ভালো জাতের তরমুজ থেকে প্রতি একরে ৪০-৪৫ টন ফলন পাওয়া যাবে।
How useful was this post?
Click on a star to rate it!
We are sorry that this post was not useful for you!
Let us improve this post!
Thanks for your feedback!
Pingback:Agriculturelearning-The biggest field of agricultural information in Bangladesh